[bangla_day], [bangla_time], [bangla_date]

[bangla_day], [bangla_time], [bangla_date]

হোম মতামত

ইসলামপুরের সেই ওড়না

শেয়ার: https://www.timebulletin24.com/news/8z4dd3

কেকা অধিকারী

১৯ জুন ২০২২ ( বাবা দিবসে বাবার জন্য আমার ভালোবাসা) সকাল বেলা নতুন কামিজ আর প্রাগৈতিহাসিক ওড়না গায়ে জড়িয়ে হোটেল রুম থেকে বেরিয়ে নিচতলার লবিতে এলাম। জল বিষয়ক শিক্ষা কার্যক্রম শেষে সহকর্মীরা সব নেপালগঞ্জ থেকে কাঠমুন্ডু ফিরব। সবাই দেখলাম লাগেজ একজায়গায় জড়ো করে রাখছে। নিজের লাগেজটা সেখানে রেখে নানান দেশী সহকর্মীদের পাশ কাটিয়ে দেশি তরুণ সহকর্মীর কাছে চলে এলাম। ‘চলেন একটু দরজার বাইরে যাই।’ স্বীকার করতেই হবে যে, এবারের ট্যুরে আমার দুই তরুণ সহকর্মী এই বৃদ্ধা রমণীর ছবি তোলার আকাঙ্ক্ষার বিষয়ে যথেষ্ট সহমর্মিতা প্রদর্শন করেছেন। সেই ভরসাতেই এই প্রস্তাব করা। বাইরে এসে বললাম “সুমন ভাই, আমার কটা ভালো ছবি তুলে দেন। এই যে আমার পরা ওড়নাটা দেখছেন এটা একটা বিশেষ ওড়না। কারণ এই ওড়নার বয়স আপনার চেয়েও বেশি।” হোটেল বিল্ডিং এমন কি গেটের বাইরে এসেও আমরা ফটো শ্যুট করলাম। কাঠমুন্ডু ফিরে হাতে যে সময়টুকু পেলাম তাতে হিসেব নিকেশ করে ছুটলাম ভক্তপুর। কিছু না দেখে একটা দেশ থেকে ফিরি কী করে? ভক্তপুরে অপর তরুণ সহকর্মী তানভীর ভাইকে অনুরোধ করে আরও কিছু ছবি তুললাম। আর নিজের কাঁচা হাতের সেলফি তো ছিলই। ছবি তোলার পুরোটা সময়ে জুড়েই মাথায় ছিল গায়ে জড়ানো সেই ওড়না। অনেক বছর ধরে আমার আলমারিতে ওড়নাটি রাখা ছিল। হালকা ছাই ঘেষা নীলের সাথে সাদা জড়ি সূতার এক খন্ড কাপড়। একই রকম বুননে ভিন্ন ডিজাইনে দুইপাশে আড়াই ইঞ্চির পাড়। আহামরি কিছু না। খুব পছন্দ করে যে কিনেছিলাম তাও না। কিন্তু কেন যেন এর সাথে বাবা, মা আর আমার কৈশোর জড়িয়ে আছে। এর সাথে বাবাকে পাই ভীষণ ভাবে। এমন নয় যে বাাবা ২০১৪ তে মারা গেলে পরে ওড়নাটার ওপর আমার টান বেড়েছে। আসলে ওটার উপর আমি বেশি টান অনুভব করতে শুরু করেছি আমার বিয়ের পর বাবার কাছ থেকে আলাদা বাসায় চলে আসার পর থেকে। ওটা দেখলেই কেন যেন এটা কিনতে গিয়ে বাাবার সাথে কাটানো সময়টার কথা মনে আসে। মনটা কেমন করে ওঠে। বাবার সাথে তো কত বারই বাজারে, মার্কেটে, এখানে ওখানে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু এই ওড়নাটির জন্য কেন আমার অন্য অনুভূতি? ঠিক কারণ জানি না। তবে আমার নিজস্ব একটা ব্যাখ্যা আছে এ বিষয়ে। অবশ্য সে ব্যাখ্যা রবি ঠাকুরের কাছ থেকে ধার করা – “সুখের মাঝে তোমায় দেখেছি দুঃখে তোমায় পেয়েছি, পেয়েছি প্রাণ ভরে।” একটু পরে বুঝিয়ে বলছি কারণটি। এদিকে এতোদিন পরে ‘আমাদের পালাং খ্যিয়াং” পেজ থেকে ওয়ান পিস জামদানি কামিজ রিডাকশন প্রাইসে দেয়ার ঘোষণা এল। কালো কাপড়ে রুপালি জামদানি কাজ। ছবি দেখে ওড়নার কথা মনে পড়ে গেল। একই সাথে বুঝতে পারলাম এবারেও কামিজের সাথে ওড়না ম্যাচিং হবে না। তবুও কিছু না ভেবেই প্রথমবারের মতো অনলাইনে কামিজের কাপড়টা অর্ডার করে টাকা বিকাশ করে দিলাম। একটু পরে টাকা প্রাপ্তির মেসেজ এল। তিন চারদিন পরে কামিজের কথা মনে পড়ায় পেইজটা খুলে দেখতে গিয়ে একই জিনিস কিন্তু অন্য একটা ডিজাইন বেশি ভাালো লাগল। মনের কথা জানালাম পালং খিয়্যাংকে। ওরা বলল ওটা থাকলে আমাকে পাঠাবে। দুদিন পরে চাহিদা মতো কাপড়টি হাতে পেলাম। স্মৃতিময় ঘটনায় আসি এবার। ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বর। এসএসসি পরীক্ষার্থী আমি। আসন্ন বড়দিন উপলক্ষে হালকা নীলের উপর সাদা চিকন চিকন দাগের খোপের মাঝে সাদা গোল ফোটা ডিজাইনের সিন্থেটিক সিল্ক কামিজ আর চোস্ত পাজামা বানিয়ছিলাম। মনে হয় খরচ কমাতে টেইলর নয়, মা-ই বানিয়ে দিয়েছিলেন জামাটা। কারণ এনজিও-র এক্সিকিউটিভ কমিটির সাথে মতের মিল হচ্ছিল না বলে বাবা হঠাৎ করে চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছিলেন। মায়ের স্কুলের শিক্ষকতার চাকরির আয় ছিল বটে, তবুও উপার্জনের প্রধান উৎসটা বন্ধ হয়ে গেলে ঢাকা শহরে ভাড়া বাসায় থাকা পরিবারের উৎকন্ঠা সরবে না হলেও নিরবে সব সদস্যকে সতর্ক কিংবা দূর্বল করে দেয়। আমাদের প্রাচুর্য না থাকলেও অভাব সংক্রান্ত কোন সমস্যাও কোনদিন ছিল না।

অভাবের অজানা ভয়টা এ জন্য আমার মনটাকে সংকুচিত ও বিষন্ন করে দিয়েছিল। বাাবার মাঝে মাঝে হঠাৎ হওয়া শারিরীক অসুস্থতা (তখনও তাঁর হার্টের ব্লক বিষয়ক জটিলতা ঢাকার ডাক্তারেরা চিহ্নিত করতে পারেননি) আমার ভেতরের ভয়টাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। এ সব নিয়ে বাবা- মা আমাদের সাথে তেমন আলোচনা না করলেও আমরা দু’ভাই-বোন আমাদের মতো করে অনিশ্চিত অবস্থাটা বুঝে নিয়েছিলাম। সংসারের বিষয়গুলো বেশ বুঝলেও আমার কিছু কিছু চাওয়া থাকত। অন্য দিকে পাপনের কোন আবদার ছিল না বলতে গেলে। আমাদের মা-ও বেশ বুঝে শুনে হিসেব করে সংসার চালাতেন। যাক্৷ যা বলছিলাম – সাধারণত গাউছিয়া, নিউমার্কেট ছিল আমার জামা-কাপড়, চুড়ি, ক্লিপ, নেইলপলিশ, দুল কেনার জায়গা। তবে বাবা ও পাপনের শার্ট, প্যান্ট বা স্কুল ড্রেসের কাপড়, বিছানার চাদর বা বেশি কিছু কিনতে আমরা কলাবাগান থেকে ইসলামপুরে যেতাম মাঝে মাঝে। এখানে সব কিছু তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যেত। তবে সেবার বড়দিনে আমার কেনাকাটাও ইসলামপুরে করেছিলাম। তখন কাপড়-চোপড় দর্জির কাছে বানিয়ে পরার চল ছিল। কম বাজেটে সালোয়ার কামিজের কাপড় কেনার পরে ভাবলাম একটা ভালো ঝলমলে ওড়না কিনলে জামাটা গর্জিয়াস দেখা যাবে। এখানেই বাঁধল বিপত্তি। একের পর এক দোকান ঘুরি ম্যাচিং রঙের কোন জড়ির ওড়না মেলে না। অনেক খোঁজার পরেও যখন মন মতো নীল রঙ পাচ্ছিলাম তখন সিদ্ধান্ত নিলাম বরং সাদা রঙে রুপালি জড়ির ওড়না নিয়ে নেব। এটা সহজে পাওয়া যাবে নিশ্চয়ই। বিধি বাম। এটাও পাওয়া যাচ্ছিল না। সব দোকানদারই বলছিল যে, সাদা রঙের ওড়না তাদের ছিল, কিন্তু বিক্রি হয়ে গেছে। বাবাও দোকানে দোকানে ঘুরে আমার সাথে রঙ মেলাতে খুব চেষ্টা করলেন। না পেয়ে সবারই মন খারাপ। ২৫ ডিসেম্বর কাছাকাছি ছিল। সে সময় আবার অন্য মার্কেটে যাওয়ার কথা বোধ হয় কেউই ভাবতে পারছিলাম না। মা তখন কাছাকাছি রঙের একটা ওড়না নিয়ে নিতে বললেন। বাবা ঠিক সায় দিচ্ছিলেন না।

আবার সমাধানও খুঁজে পাচ্ছিলেন না। আমার মনে হলো পরে আবার অন্য মার্কেটে গেলে বাড়তি খরচ হবে। তাছাড়া যাওয়ার জন্য বাড়তি সময় দিতে হবে বাবাকে, বাড়তি ধকলও যাবে বাবার শরীরের উপর। একটু চিন্তা করে আমি একটা দোকানে ঢুকে ছাই নীল রঙা ওড়নাটা নিয়ে নিলাম। আমি জানতাম আমি একটু অমত করে পরে অন্য মার্কেটে যেতে চাইলে বাবা একবারের জন্যও “না” করতেন না। তখনও জানতাম, এখনও জানি আমার বাবা আজীবন আমাকে সুখী দেখতে চেয়েছেন। এও জানি সব বাবাই সেটা চান। কিন্তু ছোট ছোট ঘটনার মধ্যে দিয়ে সন্তানের কাছে যখন সেটা স্পষ্ট হয় সেটা অনেক বড় কিছু। আমার আর আমার বাবার মধ্যে কত শত সহস্র যে তেমন ছোট ছোট “বড়” ঘটনা আছে! সেই ওড়না আজ আমি গায়ে জড়িয়ে ধরে বাবাকে ছুঁয়ে থেকেছি। মনে মনে বাবাকে বলেছি, “আমি ভালো আছি বাবা। আপনিও ভালো থাকবেন। আবার দেখা হবে আমাদের। “

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো আবশ্যক।

শেয়ার করুন