
কাকন রেজা :
আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র তাদের মূল তাসগুলো হারিয়ে ফেলেছে। যে তাস দিয়ে এতদিন তারা বাজী জিতে আসছিল। অর্থাৎ টেক্কা-রাজা-রানী সবই হারিয়ে ফেলেছে তারা। শুধু কিছু গোলাম রয়ে গেছে। এখন চেষ্টা করছে রাজনীতির জুয়ায় গোলামগুলোকে কাজে লাগাতে। কিন্তু গোলাম দিয়ে বাজী জেতা অনেকটাই অসম্ভব হয়ে যায়। তবু চেষ্টা থাকে, যদি অপরপক্ষের হাতের তাস খারাপ হয়, তাহলে গোলামও বাজিমাত করতে পারে। আমরা এখন সেই গোলাম দিয়ে জেতার চেষ্টাই দেখছি।
প্রথমে আসি ‘সিনিয়র’ সাংবাদিক প্রসঙ্গে। সাংবাদিকদের নামের আগে ‘সিনিয়র’ বসিয়ে আলাদা একটা ট্রাইব সৃষ্টি করা হয়েছে। এটা অবশ্য মন্দ নয়। এতে গোলাম চিনতে সুবিধা হয়। তাসের খেলায় অন্যের হাতের তাস জেনে যাওয়ার সুবিধা অনেক। এই ‘সিনিয়র গোলাম’রা এখন বেশ সপ্রতিভ। টকশোতে, কলামে, মন্তব্যে ভয়ংকরভাবে সক্রিয়। তাদের কাজ হচ্ছে এখন পতিত ও পলাতক ফ্যাসিস্ট তথা দিল্লির সাউথ-ব্লকের পক্ষে বয়ান উৎপাদন করা।
অনেকে ভাবেন এই ‘সিনিয়র’ সাংবাদিক নামধারী তাসের গোলামরা শুধু পলাতকদের পুনর্বাসনের পক্ষে কাজ করছেন। এই ধারণা ভুল। তারা মূলত সাউথ-ব্লকের প্রেসার গ্রুপ। পলাতকরা হলো তাদের হাতিয়ার, অস্ত্র। এই অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে সাউথ-ব্লকের হয়ে বর্তমান ক্ষমতাশীনদের কোনঠাসা করার চেষ্টা করেন তারা। কীভাবে বলি, তারা ভালো করেই জানেন, রাজাকার বা জঙ্গি কিংবা সাম্প্রদায়িক সংঘাত কোনকিছুর মাধ্যমেই পলাতকদের পুনর্বাসন করা সম্ভব নয়। কারণ এসব আলাপের আবেদন এখনকার মানুষ, বিশেষ করে জেনারেশন জেড কিংবা জেনারেশন আলফা কারোর কাছেই নেই। বাংলাদেশের রাজনীতিতে পলাতকদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে এগুলো এখন ডেড ইস্যু। কিন্তু এই ইস্যু কাজে লাগবে সাউথ-ব্লকের। যেহেতু ধর্মান্ধ একটি দল সেখানের ক্ষমতায়, তারা রাজাকার ইস্যুটাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে সাম্প্রদায়িকতার সাথে মিশিয়ে। তারা বিশ্বকে বোঝানোর চেষ্টা করবে রাজাকাররা সাম্প্রদায়িক এবং তাদের জন্য সংখ্যায় কম মানে হিন্দু এবং ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মানুষেরা বিপদের মধ্যে রয়েছে। আর পলাতকদের পরে বাংলাদেশে বর্তমান ক্ষমতায় রয়েছে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর পৃষ্ঠাপোষকরা। এটাই দিল্লির সাউথ-ব্লকের কাছে এখনকার মতন একমাত্র অস্ত্র।
‘সিনিয়র’ সাংবাদিকদের কথা তো গেল। এখন আসি রাজনীতিবিদদের কথায়। রুমিন ফারহানা নিয়ে আমি কখনো কথা বলিনি। তিনি যখন জুলাইয়ের পক্ষে উচ্চকণ্ঠ ছিলেন তখনও বলিনি। তিনি যখন ফ্যাসিজমের চরম সমালোচনা করেছেন তখনও বলিনি। কারণ ফ্যাসিজমের অধীন নির্বাচনে যখন তিনি সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি হলেন তখনই বুঝেছিলাম, ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়’। এখন বোঝা যাচ্ছে ডালের পুরোটাই কালো। একটু আগেই বললাম, সাউথ-ব্লকের একমাত্র অস্ত্র সাম্প্রদায়িকতা। তাদের সেই অস্ত্রের মহড়া দেয় আমাদের বাংলাদেশের তাসের গোলামরা। রুমিন ফারহানার উগ্রবাদের উত্থান সম্পর্কে আলাপ সেই ধারণাই দেয়। তার সুর, পলাতকদের সুর এবং দিল্লির আলাপ যখন মিলে যায়, তখনই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে ওঠে। যখন উগ্রবাদের অভিযোগে আটক সাব্বির ড. ইউনূসকে গালি দেয়, যখন রুমিন ফারহানা সেই উগ্রবাদের উত্থানের জন্য জুলাইকে দায়ী করেন এবং পলাতকরা ইউনূসকে জঙ্গি হিসেবে অভিহিত করে, আর তাতে হাওয়া দেয় সাউথ-ব্লক তখন আর সংশয়ের কিছু থাকে না।
উগ্রবাদী বাংলাদেশে নেই, সেটা যেমন অস্বীকার করা যাবে না। তেমনি উগ্রবাদীরা সংখ্যায় যে নিতান্তই স্বল্প সেটাও উল্লেখযোগ্য। আর এই উগ্রবাদের উত্থান তখনি ঘটে যখন ফ্যাসিজম বিপদে থাকে। নিকট অতীতে যখনই ফ্যাসিস্ট রেজিম কোনো সমস্যার মুখে পড়েছে, তখনই দেখা গেছে জঙ্গি নাটকের। সিটিটিসি’র বিভিন্ন নামের অপারেশন। তিনদিন আগের লাশ রেখে গুলি চালিয়ে উদ্ধারের নাটক বলে খ্যাত সেই অপারেশন। এখন যখন ফ্যাসিস্ট রেজিম স্বেচ্ছা নির্বাসনে তখন তাদের ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টার অংশ হলো সেই উগ্রবাদ। যেই উগ্রবাদকে আবিষ্কার করেন সেই তাসের গোলামরা। উগ্রবাদ যদি টিকে থাকে তাদের জন্যই থাকবে। কারণ, উগ্রবাদই পারে তাদের টিকিয়ে রাখতে এবং তা তাসের গোলামদের আলাপে আর সোশ্যাল মিডিয়ায়। জুলাইপন্থীদের জন্য উগ্রবাদ মূলত আপদ স্বরূপ। সুতরাং জুলাই তথা বাংলাদেশপন্থীরা কখনো চাইবে না উগ্রবাদ টিকে থাকুক।
খুব সরল চোখে দেখুন তো, পাশের দেশে মুসলিমদের উপর কী পরিমাণ অত্যাচার হচ্ছে, এনিয়ে এই তাসের গোলামরা কী মুখ খুলেছেন? বলেছেন, মুসলমানদের উপর অত্যাচার বন্ধ করো। আমরা নই তোমরাই সাম্প্রদায়িক। জানি, কেউ বলবেন, অন্যদেশের ব্যাপারে আমরা কেন নাক গলাবো। কথা ঠিক। কিন্তু যখন অন্যদেশ আমাদের ব্যাপারে নাক গলায়, তখন তো তাসের গোলামরা প্রতিবাদ করেন না। বলেন না, আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে তোমরা কেন নাক গলাবে। খুব সরল একটা ব্যাপার। এটা কারোরই চোখ এড়ায় না। সবাই জানে। কিন্তু আমাদের তাসের গোলামরা এতটাই নির্লজ্জ যে, তারা এসব ব্যাপারে কোনই রাখঢাক রাখেন না। আমরা বুঝি, তাদের লক্ষ্য হলো বিশ্বসমাজ। তারা জানে, আমাদের দেশের লোক তাদের কী চোখে দেখে। কিন্তু ওই যে প্রভুর সন্তুষ্টি। তাদের সম্মিলিত চিৎকারে যদি বিশ্বসমাজ প্রভুদের পক্ষে যায়, পলাতকদের পুনর্বাসন সম্ভব হয়।
অদ্ভুত না, তাদের কাছে বিজেপি’র বিরুদ্ধে কোনো আলাপ নেই। তাদের কাছে বিজেপি সহনীয়। কিন্তু অসহনীয় হলো, যারা আমাদের এখানে ইসলামের কথা বলে। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’, ‘আল্লাহ উপর বিশ্বাস’ সংযোজন করলেন, যিনি একজন জীবিত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সর্বোচ্চ খেতাবপ্রাপ্ত, তখন তাকেও রাজাকার বলতে বাধেনি না তাসের গোলামদের, এখনও বাধে না। বিপরীতের বিজেপি তাদের জন্য সাম্প্রদায়িক নয়! আজব না?
আসি ভারতের কথায়। ভারত মুখে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। কিন্তু তার প্রতিটি স্তরে রয়েছে ধর্মের উপস্থিতি। অশোক স্তম্ভ হলো ভারতের জাতীয় প্রতীক। তার নিচের লেখাটি ‘সত্যমেব জয়তে’ সেটাও ধর্মীয়। হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বেদ এর বাণী। অশোক স্তম্ভের সিংহ তাও ধর্মীয় চেতনার ফসল। ভারতের পতাকার মধ্যে থাকা অশোক চক্র কে অভিহিত করা হয় ধর্মচক্র হিসেবে। যা হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর অস্ত্র। ভারতের পরতে পরতে রয়ে গেছে ধর্ম। সেই ভারত যদি ধর্মনিরপেক্ষ হয়, তবে ধর্মের পক্ষে কারা! না, বলছি না যে, ধর্মের পক্ষে থাকলেই দোষের কিছু। নেপাল তো হিন্দুরাষ্ট্র, কিন্তু সেখানে তো সাম্প্রদায়িকতা নেই। অন্যধর্মের মানুষের উপর নেপালিরা হিংসাপরায়ণ নয়। সৌদি আরবেও তো অন্যধর্মের প্রতি কোনো বিষোদগারের কথা শোনা যায় না। সেখানে ভিন্নধর্মের মানুষ নিরাপদেই আছেন। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে মুসলমানদের কথা ভাবুন। শুধু মুসলমান কেন হিন্দু ধর্মের দলিতদের কথাই বাদ দিই কেন। তারাও তো লাঞ্ছনার শিকার। অত্যাচারিত।
অথচ সেই দেশটিই আমাদের দেশে সাম্প্রদায়িকতা খোঁজে। কী অদ্ভুত ব্যাপার! শুধু খোঁজেই না, টেক্কা আর রাজা-রানী হারানোর পরও তাসের গোলাম দিয়ে আমাদের অস্থিতিশীল করার অনবরত চেষ্টা করে। আর আমাদের তাসের গোলামরাও, আহা! ‘বড় মিয়া তো বড় মিয়া, ছোট মিয়া বহুত আচ্ছা’।
লেখক – কবি, কলামিস্ট, সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক