
খন্দকার মুস্তাফিজুর রহমান তুহিন
লালন দর্শন ভাবজগতের এক অনন্য মানবতাবাদী ধারা, যার মূল কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ, তার পরিচয়, স্বাধীনতা, এবং ভেতরের সত্যের অনুসন্ধান। লালন সাঁই ধর্ম, জাত, বর্ণ, লিঙ্গ,এসব সামাজিক বিভাজনকে অস্বীকার করে তিনি বলেছেন, সবার উপরে মানুষ সত্য – এই বোধই তাঁর দর্শনের প্রাণ।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায়, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়, জাতিগত বিভাজন এবং মতাদর্শিক মেরুকরণ ক্রমশ তীব্র হচ্ছে, সেখানে লালনের চিন্তা এক শক্তিশালী বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। তিনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের গণ্ডিতে আবদ্ধ ছিলেন না, বরং তিনি প্রশ্ন তুলেছেন,মানুষ কি কেবল তার পরিচয়ে, না তার মানবিকতায়? এই প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক, যখন রাজনীতি প্রায়শই মানুষের ভেতরের বিভাজনকে উস্কে দেয়।
লালনের দর্শনে দেহতত্ত্ব এবং অন্তর্দর্শন গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, সত্যের সন্ধান বাইরে নয়, নিজের ভেতরেই। এই চিন্তা আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি আত্মসমালোচনার আহ্বান জানায়,আমরা কি সত্যিই মানবিক মূল্যবোধে দাঁড়িয়ে আছি, নাকি কেবল পরিচয়-ভিত্তিক ক্ষমতার খেলায় জড়িয়ে পড়ছি? আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সহনশীলতা ও সহাবস্থান। লালন সমাজে ভিন্নতার মধ্যেও ঐক্যের কথা বলেছেন। বর্তমান সময়ে যখন ভিন্ন মত বা বিশ্বাসকে সহজে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তখন লালনের এই দৃষ্টিভঙ্গি একটি সহনশীল সমাজ গঠনের পথ দেখাতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, লালনের দর্শনকে কেবল সাংস্কৃতিক বা আধ্যাত্মিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে, রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোতে তার প্রয়োগ খুবই সীমিত। এর কারণ হতে পারে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির স্বার্থ, যেখানে বিভাজন প্রায়ই একটি কার্যকর হাতিয়ার।
সবশেষে বলা যায়, লালন দর্শন কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নয়, এটি এক চিরন্তন মানবিক আহ্বান। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। যদি আমরা সত্যিই একটি ন্যায়ভিত্তিক, সহনশীল ও মানবিক সমাজ গড়তে চাই, তবে লালনের “মানুষভজনা”র ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে এবং প্রয়োগ করতে হবে।
লেখক – রাজনীতিবিদ, গবেষক