
স্পোর্টস ফিচার ডেস্ক
নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে বা একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ফুটবল বিশ্ব বুঁদ হয়েছিল ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো আর লিওনেল মেসির দ্বৈরথে। ফুটবলপ্রেমীদের মনে একটাই প্রশ্ন ছিল— এই দুই মহাতারকার যুগের পর ফুটবলকে শাসন করবে কে? উত্তরটা পেতে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। ফুটবল বিশ্বে এখন চলছে এক নতুন দানবের রাজত্ব। গতি, অবিশ্বাস্য শারীরিক শক্তি আর নিখুঁত ফিনিশিংয়ের এক মারণাত্মক কম্বিনেশন নিয়ে ফুটবল বিশ্ব কাঁপিয়ে বেড়াচ্ছেন ২৫ বছর বয়সী নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড।

জিনগতভাবেই অ্যাথলেট: ফুটবল যার রক্তে ২০০০ সালের ২১ জুলাই ইংল্যান্ডের লিডসে জন্ম নেন হালান্ড। তার বাবা আলফ-ইঙ্গে হালান্ড ছিলেন নরওয়ের সাবেক পেশাদার ফুটবলার, যিনি প্রিমিয়ার লিগে ম্যানচেস্টার সিটি ও লিডস ইউনাইটেডের হয়ে খেলেছেন। আর মা গ্রাই মারিতা ব্রাউট ছিলেন একজন জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হেপ্টাথলিট। ফলে খেলাধুলার প্রতি অদম্য টান আর অ্যাথলেটিক শরীর তিনি জিনগতভাবেই পেয়েছিলেন। শৈশবেই নরওয়ের ব্রাইনে (Bryne) শহরের একাডেমিতে তার ফুটবলের হাতেখড়ি হয়।

বরফ গলে যেভাবে অগ্নুৎপাত: ক্যারিয়ারের উল্কি উত্থান হালান্ডের উত্থানের গল্পটা যেকোনো রূপকথাকেও হার মানায়: সালজবার্গ ও সেই ৯ গোলের ধামাকা: ২০১৯ সালের অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে হন্ডুরাসের বিপক্ষে নরওয়ের ১২-০ ব্যবধানের জয়ে একাই ৯ গোল করে বিশ্বমঞ্চে নিজের আগমনী বার্তা দেন তিনি। এরপর অস্ট্রিয়ান ক্লাব রেড বুল সালজবার্গের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে গোলের বন্যা বইয়ে দেন। বরুশিয়া ডর্টমুন্ডে বিশ্বজয়: জার্মান ক্লাবে যোগ দিয়েই অভিষেক ম্যাচে বদলি নেমে মাত্র ২৩ মিনিটে হ্যাটট্রিক করেন। ডর্টমুন্ডের হয়ে ৮৯ ম্যাচে করেন ৮৬ গোল! ম্যানচেস্টার সিটিতে ইতিহাস লিখন: ২০২২ সালে বাবার সাবেক ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দিয়েই প্রিমিয়ার লিগে এক মরসুমে সর্বোচ্চ ৩৬ গোলের সর্বকালের রেকর্ড ভাঙেন। প্রথম মরসুমেই জেতেন ঐতিহাসিক ‘ট্রেবল’ (প্রিমিয়ার লিগ, এফএ কাপ এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগ)। নরওয়ের রাজপুত্র: মাত্র ২৫ বছর বয়সেই তিনি নরওয়ে জাতীয় দলের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা (৫৪ ম্যাচে ৬২ গোল) হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন।

রোবটের মতো জীবনযাত্রা: হালান্ডের অবিশ্বাস্য ‘ডায়েট ও লাইফস্টাইল’ হালান্ডের এই অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের পেছনে রয়েছে তার কঠোর ও অদ্ভুত কিছু নিয়ম। সতীর্থরা তাকে মজা করে ‘রোবট’ বলে ডাকেন। ৬০০০ ক্যালরির ডায়েট: তিনি প্রতিদিন প্রায় ৬,০০০ ক্যালরি খাবার গ্রহণ করেন। তার প্রিয় খাবারের তালিকায় রয়েছে গরুর কলিজা ও হৃদপিণ্ড (হার্ট), যা সাধারণ মানুষ সহজে মুখে তোলে না। তিনি কেবল ফিল্টার করা বিশেষ পানি পান করেন। ব্লু-লাইট চশমা: রাতে ঘুমানোর কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই তিনি বিশেষ ধরনের ব্লু-লাইট ব্লকিং চশমা পরেন, যাতে স্ক্রিনের আলো তার চোখের ক্ষতি না করে এবং গভীর ঘুম হয়। ধ্যান বা মেডিটেশন: মাঠে গোল করার পর হালান্ডকে প্রায়ই ‘পদ্মাসন’ হয়ে ধ্যান করার ভঙ্গিতে উদযাপন করতে দেখা যায়। তিনি মনে করেন, মানসিক শান্তি ও মনোযোগই তাকে গোলপোস্টের সামনে শান্ত রাখে।

কেন তিনি অনন্য? ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার এই স্ট্রাইকার যখন ঘণ্টায় ৩৬ কিলোমিটার গতিতে বল নিয়ে ছোটেন, তখন প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের দেওয়ালে ধাক্কা খাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। তিনি কেবল একজন ফুটবলার নন, তিনি আধুনিক ফুটবলের এমন এক ‘প্রোটোটাইপ’ যাকে আটকানোর কোনো ফর্মুলা এখনো কোনো কোচ বের করতে পারেননি। পেলে, ম্যারাডোনা, রোনালদো, মেসির পর ফুটবল ইতিহাস এখন নতুন এক অধ্যায়ে— যা নির্দ্বিধায় ‘আর্লিং হালান্ড যুগ’